কখনো কখনো বন্ধু বান্ধবদের খুব দরকার হয়। কিছু কথা সব সময়ই থাকে যা শুধু কিছু জানের দোস্তর সংগেই শেয়ার করা যায়। আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভয়াবহ রকমের খারাপ। আমি দরকারী বেদরকারী প্রায় সব কিছুই বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে সব সময় অস্থির থাকি।
ঢাকায় সেটল হবার পর বাবু, মুনমুন, সিলভী, তাজদের সাথে কিছু জিগরী দোস্তত্ব হয়ে যায়। কত রাত আমি আর বাবু ক্লাসের সুনয়না মেয়েটির হাসি নিয়ে গবেষনা করে শেষ করে দিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। বাবুটা হঠাৎ প্রেমে পড়ে যায়। আর তার যে কত কাহিনী। আমি অবশ্য সারা বছর প্রেমেই পড়ে থাকতাম। সিলভী প্রেমের বয়স তখন মনে হয় ৭ বছরের বেশী। কিন্তু যে বেকুবকে পৃথিবীর অন্যতম সেরা এই মেয়েটি মন দিয়েছে সেই গাধাটাকে নিয়ে আমাদের অনেক অভিযোগ ছিল। মুনমুন ছিল কেমন জানি, একটু আনমোনা, একটু উদাসী, একটু অলস কিন্তু কিভাবে যেন সব পরীক্ষায় আমার চেয়ে অনেক নম্বরের ব্যবধানে এগিয়ে থাকত। আমি হিংসায় জ্বলে পুড়ে মড়তাম। তবে ওর খামচীর দাগগুলো এখনো মনে হয় আমার কবজীতে পাওয়া যাবে।
একবার মুনমুনের জন্মদিনে আমরা একটি রেস্টুরেন্টে গেছি খেতে। সেখানে কি নিয়ে যেন বিশাল ঝগড়া হলো আমার সাথে প্রায় সবার। ঝগড়া ঝাটি শেষ করে মোটামুটি আপোষ হবার পর আমি পকেট থেকে একটি কবিতা বের করলাম।
কালো আকাশে নীল আলো,
জীবন সুতা এলোমেলো।
তাক করা কামানের গোলা
হলুদ শর্ষের আসা যাওয়া,
মিনমিনিয়ে দুটি শব্দ
নাই বা হলে এরচে' নিস্তব্ধ।
মুছে যাওয়া কথার বীনা
নতুন সূর্যের আশা, বায়না,
মুছে ফেলে ক্লান্তি, ঋণ,
নতুন করে, শুভ জন্মদিন।
মুনমুনের পুরো নাম, কাজী তাহমিনা মুনমুন।
বড়াপী ছিল মুনমুনের বড় বোন। আমার অন্যতম বেস্ট ফ্রেন্ড। সারাজীবন তাই ভেবে আমি গর্বিত হবো। কক্সবাজারে আমি আর বড়াপি সারা সময় এক সংগে থাকতাম দেখে ফটোগ্রাফার বেটা অন্য কিছু ভেবেছিল। বেটা বেক্... আসলে মনে হয় আর কিছু দিন আগে যদি জন্মাতাম তো বড়াপীকে নির্ঘাত প্রেম নিবেদন করে বসতাম। হি হি...
আমি তখন একটু আবৃত্তি চর্চার দুঃসাহস দেখিয়েছিলাম। আস্ফর্ধা খুব বেড়েছিল নিশ্চয়, কারন আমি কিছু আবৃত্তি রেকর্ডও করেছিলাম। দেশ ছাড়ার পড় সিলভী আমাকে চিঠি লিখে, তোর আবৃত্তি করা শেষের কবিতা হঠাৎ হঠাৎ আমার কানে বেজে উঠে।
মোর লাগি করিওনা শোক,
আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
এরপর আচমকা পারিবারিক কিছু ব্যাপারে আমি ছোটখাট দুর্যোগের মধ্যে পড়ি। এর এক পর্যায়ে বন্ধদের সংগে খুব দুরত্ব তৈরী হয়ে যায়। অনেকটা আমার দোষে আর কিছুটা ভাগ্য দোষে তারা আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সংকট যখন অনেকটা নিয়ন্ত্রনের বাইরে আমি ঝাপটে ধরতে চাই আমার বন্ধদের, খুজেঁ ফিরি তাদের... কিন্তু ততদিনে তারা আমার অনেক পর হয়ে যায়। শুনিযে, বড়াপীর সংসারে আমি অজান্তে কিছু ঝামেলা তৈরী করে দিয়েছি। মুনমুন আমাকে বড়াপীর বাসায় ফোন করতে মানা করে দেয়।
এরপর আরো কিছু সময় কেটে যায়... বড়াপীর দুটি ছেলে হয়, মুনমুন এক ক্লাসমেটকে বিয়ে করে, বাবুটাও তার সেই প্রেমিকাকে শেষ পর্যন্ত পায়... কিন্তু আমার কথা ওরা কেউ মনে করে না।
হঠাৎ হঠাৎ ওদের খুব দেখতে ইচ্ছে করে...